Wednesday , November 14 2018
Home / ইসলাম / মসজিদের দেশ বাংলাদেশ ও মসজিদের শহর ঢাকা

মসজিদের দেশ বাংলাদেশ ও মসজিদের শহর ঢাকা

মহান আল্লাহর আনুগত্যের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও সামষ্টিক আত্মনিবেদনের  স্থান ‘মসজিদ’, যা ‘বায়তুল্লাহ’ বা আল্লাহর ঘর। মসজিদ অর্থ সিজদার স্থান। মসজিদ মুসলিম সমাজের অন্যতম পবিত্র স্থান।   মুসলিম ঐতিহ্য, স্থাপত্যকৌশল, বিজয়স্মারক এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক বহুবিধ উজ্জ্বলতায় মসজিদের সবিশেষ ভূমিকা আছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মসজিদগুলো আল্লাহর। ’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১৮)

বাংলাদেশ হলো মসজিদকেন্দ্রিক সমাজের আদর্শ। রংপুর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রামের “মজেদের আড়া” নামক জঙ্গলে ১৯৮৭ সালে আবিষকৃত হয় প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। জঙ্গলটি খনন করে একটি ইট পাওয়া যায়। এতে কালেমা তায়্যিবা ও ৬৯ হিজরী লেখা রয়েছে। হিজরী ৬৯ মোতাবেক ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দ। রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ হতে জানা যায়, রাসূল (স) এর মামা বিবি আমেনার চাচাতো ভাই আবু ওয়াক্কাস (রা) ৬২০-৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন (পৃষ্ঠা ১২৬)। অনেকে অনুমান করেন যে, ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দের মসজিদটি আবু ওয়াক্কাস (রা) নির্মাণ করেন। লালমনিরহাট জেলার এ প্রাচীন মসজিদ ও এর শিলালিপি দেখে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের (১২০৪ খ্রিঃ) ছয়শ’ বছর আগেই বাংলা অঞ্চলে সাহাবীর মাধ্যমে ইসলামের আবির্ভাব ।

অন্যদিকে ‘জাতীয় মসজিদখ্যাত’ ‘বায়তুল মোকাররম’ আধুনিক ঢাকার কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হয় ২৬ ডিসেম্বর ১৯৬২ সালে। রাজধানী ঢাকাকে ‘মসজিদের শহর’ বলা হয় এর সংখ্যা, স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিকতার বিচারে। ঢাকার রয়েছে মসজিদ স্থাপত্যের গর্বিত সোনালি ঐতিহ্য। প্রতিদিন মিনারে মিনারে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিত হয় এক লাখ ৮০ হাজারবার। ঢাকায় রয়েছে ছয় হাজার মসজিদ। (ই.ফা.বা.)

ঢাকার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন চকবাজার জামে মসজিদ। সুবাদার শয়েস্তা খান ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণশৈলীর কারণে যা কিনা ‘আবাসিক মাদরাসা মসজিদ’। মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত ‘ঢাকার ঐতিহ্য’ ‘সাতগম্বুজ মসজিদ’ নির্মিত হয় ১৬৭৬, মতান্তরে  ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে। ব্যস্ত ঢাকার কারওয়ান বাজারে খাজা আম্বর ১৬৮০, মতান্তরে ১৬৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে যে মসজিদ নির্মাণ করেন, তা ‘আম্বর শাহ’ মসজিদ নামে সুপরিচিত। মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নির্মাণশৈলীর একমাত্র উল্লেখযোগ্য সুবৃহৎ নিদর্শন ‘লালবাগ শাহী মসজিদ’। সুবাদার আজিমুশশানের  প্রিয় শাহজাদার নামে একে ‘ফারুক সিয়ার মসজিদ’ও বলা হয়। মসজিদটি ১৭০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়। মসজিদের সাদা ধবধবে গম্বুজে অসংখ্য তারার মোটিফের কারণে ঢাকার গর্ব তারা মসজিদ। নির্মাতার নামে মসজিদটিকে (মির্জা গোলাম পীর, মৃত ১৮৬০) ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’ও বলা হয়। আরমানিটোলার আবুল খায়রাত রোডে অবস্থিত মসজিদটি সম্ভবত উনিশ শতকের শুরুতে নির্মিত। কালের সাক্ষী ঢাকার  মসজিদের অন্যতম ‘বিনোদবিবির মসজিদ’ (১৪৫৬), ইসলাম খান মসজিদ (১৬৩৫-৩৯), শায়েস্তা খান মসজিদ (১৬৬৪-৭৮), খাজা শাহবাজ মসজিদ (১৬৭৯), আজিমপুর মসজিদ (১৭৪৬), আল্লাহকুরি  মসজিদ (মোহাম্মদপুর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ ও গাউসুল আজম মসজিদ ইত্যাদি।

বাংলাদেশেও অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী মসজিদ রয়েছে। দক্ষিণ বাংলা বিজয়ী খান আল-আজম উলুগ খান জাহান (রহ.) (মৃত্যু ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও উপমহাদেশের অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ নির্মাণ করেন। মসজিদটিকে UNESCO ‘বিশ্ব প্রত্ন নিদর্শন’ (World heritage) হিসেবে ঘোষণা করেছে। সুলতান নুসরাত শাহ্ (১৫২৩ খ্রিস্টাব্দ) রাজশাহী শহরের ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে নির্মাণ করেন ‘বাঘা মসজিদ’, যা বাংলাদেশের প্রত্ন বিভাগের অধীন একটি সংরক্ষিত নিদর্শন ও আকর্ষণীয় স্থাপনা। বরেণ্য ইসলাম প্রচারক শাহ্ বাবা কাশ্মীরি (রহ.)-এর সম্মানে সাইদ খান পন্নি ১০১৯ হিজরি (১৬১০-১১ খ্রিস্টাব্দ) টাঙ্গাইলের ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়ায় নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক ‘আতিয়া জামে মসজিদ’। কথিত আছে, ‘অন্দরকিল্লা মসজিদ’ হলো মোগলদের তৈরি চট্টগ্রামের প্রথম মসজিদ। সুবাদার শায়েস্তা খানের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও চট্টগ্রাম বিজয়ী বুজুর্গ উমিদ খান কর্তৃক প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি নির্মিত হয়। তবে শিলালিপিতে আছে শায়েস্তা খান ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন। গাজীপুরের কাপাসিয়ার গায়েবি মসজিদ, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের বেলুয়া খানবাড়ি মসজিদ ইত্যাদি স্বনামে খ্যাত।

মুসলিম ঐতিহ্যের  জীবন্ত কিংবদন্তি বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। এগুলো কোনো ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং তাওহিদি চেতনায় সমুজ্জ্বল। এগুলো মানবজাতির অহংকার। বাংলাদেশে রয়েছে দুই থেকে আড়াই লাখ মসজিদ। এসব মসজিদ ইবাদতের কেন্দ্র ও পারলৌকিক মুক্তির দিশারি হিসেবে চিরকাল টিকে থাকবে। মুসল্লি ও স্থাপত্য সৌন্দর্যে যুগে যুগে হতে থাকবে সমৃদ্ধ। কেননা প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন,  কিয়ামতের কঠিন দিনে সাত শ্রেণির লোক মহান আল্লাহর ‘আরশের ছায়া’ লাভে ধন্য হবেন; যাঁদের অন্যতম ‘মসজিদ অন্তপ্রাণ’—অর্থাৎ যাঁর অন্তর মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে (বুখারি)।

তাই তো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অন্তিম ইচ্ছা—‘

মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে
গোর-আজাব থেকে এ গুণাহগার পাইবে রেহাই।
…………………………………………………

আরও পড়ুন

মেয়েদের সঙ্গে ফেসবুক-ইন্টারনেটে কথা বলার বিধান কী?

প্রশ্ন : মেয়েদের সঙ্গে ফেসবুক-ইন্টারনেটে কথা বলার বিধান কী? উত্তর : যদি দ্বীনী উপকার নিহিত থাকে, সেই …